শিক্ষা ও চিকিৎসা যখন আভিজাত্য

বেসরকারি শিক্ষা ও চিকিৎসা কেন আভিজাত্যের প্রতীক? দুর্নীতির অর্থ কীভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়াচ্ছে—

একটি পরিবারের আয় দিয়ে জীবন চলে—এই ধারণা এখন ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আধুনিক বাংলাদেশে অসংখ্য পরিবার এমন এক বাস্তবতায় বসবাস করছে, যেখানে মাসিক আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্বিগুণ, কখনো তারও বেশি। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রধান দুটি খাত হলো—সন্তানদের শিক্ষা এবং পরিবারের চিকিৎসা। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদেশে পড়ালেখা এবং বেসরকারি ও বিদেশি চিকিৎসা গ্রহণ এখন শুধু প্রয়োজন নয়, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা যখন আভিজাত্য
একটি বেসরকারী হাসপাতাল

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ব্যয় কি বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আর এর প্রভাব পড়ছে কোথায়?

সরকারি সেবার প্রতি অনাস্থা

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রতি মানুষের ঝোঁকের মূল কারণ সরকারি ব্যবস্থার প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা। দেশের সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিকক্ষ সংকট, শিক্ষক ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী চাপ এবং পাঠদানের মান নিয়ে নিয়মিত অভিযোগ রয়েছে। একই চিত্র সরকারি হাসপাতালগুলোতেও। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা কম, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নেওয়ার বিড়ম্বনা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে।

ঢাকার এক অভিভাবক বলেন,

“আমি চাই আমার সন্তান ভালো শিক্ষা পাক। সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ক্লাসে ৬০ জন ছাত্র, শিক্ষক একজন। তখন বাধ্য হয়েই বেসরকারি স্কুলে দিই।”

প্রভাবশালী বেসরকারি খাত

অন্যদিকে, বেসরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের মালিকানাধীন একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগ রয়েছে, এই গোষ্ঠী নানাভাবে নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলোকে যুগোপযোগী ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। সচেতন মহলের মতে, সরকারি সেবাকে দুর্বল রেখে বেসরকারি সেবাকে ‘উন্নত’ হিসেবে উপস্থাপন করাই এই গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক কৌশল।

আয়-ব্যয়ের গড়মিল

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের মাসিক আয় ৫০–৬০ হাজার টাকা হলেও সন্তানের স্কুল ফি, কোচিং, ইংরেজি ভার্সন বা ইংরেজি মাধ্যমের খরচেই চলে যাচ্ছে ৭০–৮০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বড় অংকের বাড়িভাড়া, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যয় ও জীবনযাত্রার অতিরিক্ত খরচ।

একজন অর্থনীতিবিদ বলেন,
“এই ব্যয়ের সঙ্গে বৈধ আয়ের কোনো মিল নেই। প্রশ্ন হচ্ছে—এই টাকা আসছে কোথা থেকে?”

শিক্ষা ও চিকিৎসা যখন আভিজাত্য
একটি বেসরকারী বিশ্বদ্যালয়

দুর্নীতির ছায়া

বিশ্লেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশই আসে দুর্নীতির অর্থ থেকে। ঘুষ, কমিশন, অবৈধ লেনদেন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্জিত অর্থই অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে। ফলে দুর্নীতি শুধু প্রশাসনিক ব্যাধি নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যও নষ্ট করছে।

দুর্নীতির এই অর্থ বাজারে প্রবেশ করে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর।

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে যখন অপ্রদর্শিত ও অবৈধ অর্থ প্রবেশ করে, তখন পণ্যের প্রকৃত চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলাফল—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া—সবকিছুর দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যাদের আয় বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয় বেড়েই চলেছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূল সমাধান রাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে। শিক্ষা ও চিকিৎসা—এই দুই খাত যদি রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে নাগরিকদের জন্য নিশ্চিত করে, তাহলে একাধিক সমস্যার একযোগে সমাধান সম্ভব।

রাষ্ট্র যদি সকল নাগরিকের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় বহন করে, তাহলে—

  • পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় কমবে

  • দুর্নীতির প্রণোদনা হ্রাস পাবে

  • বাজারে অপ্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহ কমবে

  • দ্রব্যমূল্যের ওপর চাপ কমবে

দুই শিফট: বাস্তবসম্মত সমাধান

নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করেন, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলোতে দুই শিফট চালু করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান। এতে নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। বিদ্যমান অবকাঠামোই ব্যবহার করা যাবে আরও দক্ষভাবে।

শুধু প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মী নিয়োগের। এর ফলে একদিকে যেমন সেবার মান উন্নত হবে, অন্যদিকে বেকারত্বও কমবে।

একজন স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষক বলেন,
“একই অবকাঠামো দিয়ে যদি দ্বিগুণ মানুষকে সেবা দেওয়া যায়, তাহলে সেটা রাষ্ট্রের জন্যও লাভজনক, জনগণের জন্যও।”

ভবিষ্যৎ কোন পথে?

বেসরকারি শিক্ষা ও চিকিৎসাকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা একটি সমাজকে ধীরে ধীরে বৈষম্য ও দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়। শিক্ষা ও চিকিৎসা যদি নাগরিকের অধিকার না হয়ে বিলাসে পরিণত হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।

সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা শুধু সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়—এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত।

শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবসা নয়—এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই উপলব্ধি থেকেই শুরু হতে পারে একটি ন্যায্য ও টেকসই সমাজ গঠনের পথ।


FAQ: 

👉 কেন বেসরকারি শিক্ষা ও চিকিৎসা আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠছে?

সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে অনাস্থা এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতার কারণে বেসরকারি সেবা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

👉 এর সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক কী?

 আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের গড়মিল থেকে দেখা যায়, অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ আসে অবৈধ ও দুর্নীতির অর্থ থেকে।

👉 দুর্নীতি কীভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ায়?

 দুর্নীতির অর্থ বাজারে প্রবেশ করে অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি করে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়ায়।

👉 রাষ্ট্র কীভাবে সমাধান করতে পারে?

 শিক্ষা ও চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্র নিলে ব্যয় কমবে, দুর্নীতি কমবে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে।

👉 দুই শিফট ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

  এতে নতুন অবকাঠামো ছাড়াই সেবা বাড়ানো সম্ভব এবং কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url