দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নীরব কারণ: গণমাধ্যমের ভূমিকা কতটা দায়ী?

 দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অদৃশ্য প্রভাবক

বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন আর সাময়িক কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, ভোগ্যপণ্য এমনকি সেবা খাত—সবখানেই সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যচাপে বিপর্যস্ত। সরকার, অর্থনীতিবিদ ও গণমাধ্যমে আলোচনায় সাধারণত যেসব কারণ উঠে আসে, তার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুদদারি, অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিলাভের প্রবণতা, বাজার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আমদানি নির্ভরতা।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নীরব কারণ

তবে এসব দৃশ্যমান কারণের বাইরে আরেকটি বিষয় দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থেকে যাচ্ছে—তা হলো গণমাধ্যমের অতিমাত্রায় বিস্তার ও বাণিজ্যিকীকরণ, যা পরোক্ষভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


গণমাধ্যমের বিস্তার: তথ্যের জোয়ার, ব্যয়ের পাহাড়

গত দুই দশকে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশে রয়েছে—

  • শতাধিক জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকা

  • হাজারের বেশি অনলাইন নিউজ পোর্টাল

  • প্রায় অর্ধশত টেলিভিশন চ্যানেল

  • এফএম ও কমিউনিটি রেডিও

  • অসংখ্য ইউটিউব চ্যানেল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম

                               

এই বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যম পরিচালনা করতে প্রয়োজন বিপুল অর্থ—স্টুডিও ভাড়া, প্রযুক্তি, জনবল, সম্প্রচার ব্যয়, লাইসেন্স ফি, সার্ভার ও ডিজিটাল অবকাঠামো। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমের প্রধান আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন। ফলে সংবাদ পরিবেশন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ।

ব্যবসায় বিশ্লেষকের মত-

ব্যবসা বিশ্লেষক ও সাবেক এফবিসিসিআই পরিচালক হুমায়ুন রশীদ বলেন,

“বাজারে যখন বড় কোম্পানির দখল বাড়ে, তখন প্রতিযোগিতা কমে যায়। প্রতিযোগিতা কমলে দাম নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও দুর্বল হয়ে পড়ে। গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ব্যয় এই কর্পোরেট আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করছে।”


দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নীরব কারণ

বিজ্ঞাপননির্ভর গণমাধ্যম ও পণ্যমূল্য

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো পণ্য বা সেবার চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হয় কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে—উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয়, বিপণন ব্যয় এবং লাভের মার্জিন। এখানে বিপণন ব্যয়ের বড় অংশ জুড়ে থাকে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন খরচ

একটি কোম্পানি যদি মাত্র ৪–৫টি গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয়, তবে ব্যয় তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে। কিন্তু একই পণ্য বা সেবা যখন ১৫–২০টি টেলিভিশন চ্যানেল, একাধিক দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়, তখন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

এই বাড়তি ব্যয় কোম্পানি নিজের কাঁধে বহন করে না। বরং তা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন ব্যয় বহন করেন সাধারণ ভোক্তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবেই গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের বিস্তার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটি নীরব চক্র তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞ মত-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন,

“বাংলাদেশে অধিকাংশ গণমাধ্যমের নিজস্ব টেকসই অর্থনৈতিক মডেল নেই। বিজ্ঞাপনই প্রধান আয়ের উৎস। ফলে গণমাধ্যম যত বাড়ছে, বিজ্ঞাপনের ওপর চাপ তত বাড়ছে—আর সেই চাপের পরোক্ষ বোঝা গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর।”


অতিরিক্ত গণমাধ্যম, অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা

গণমাধ্যমের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিজ্ঞাপন বাজারেও তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেক গণমাধ্যম—

                                   

  • বিজ্ঞাপন রেট বাড়াচ্ছে

  • কর্পোরেট বিজ্ঞাপনদাতার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে

  • জনস্বার্থের চেয়ে বাণিজ্যিক কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে

এর ফলে বাজারে বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো সুবিধা পাচ্ছে, আর ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে যখন বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য বাড়ে, তখন প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদের বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS)-এর সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন,

“কোম্পানিগুলো কখনোই বিজ্ঞাপন ব্যয়কে লোকসান হিসেবে নেয় না। এই ব্যয় সরাসরি পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। গণমাধ্যম যত বেশি, বিজ্ঞাপন ব্যয় তত বাড়ে, আর সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাই বহন করে।”

তার মতে, এটি এক ধরনের hidden inflationary pressure, যা সরাসরি চোখে পড়ে না, কিন্তু বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।


দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নীরব কারণ

সংবাদ শিরোনাম, আতঙ্ক ও কৃত্রিম চাহিদা

গণমাধ্যমের প্রভাব শুধু বিজ্ঞাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সংবাদ পরিবেশনের ভাষা ও উপস্থাপনাও বাজারে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় গণমাধ্যমে দেখা যায়—

  • “চাল-ডালের ভয়াবহ সংকট”

  • “রমজানে দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা”

  • “তেলের বাজারে অস্থিরতা চরমে”

এ ধরনের শিরোনাম সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। ফলস্বরূপ, মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনে ঘরে মজুদ করতে শুরু করে। এতে হঠাৎ করে বাজারে চাহিদা বেড়ে যায়, সরবরাহের ওপর চাপ পড়ে এবং ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম গবেষকের মত-

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. রওশন আরা বলেন,

“সংবাদ যদি দায়িত্বশীল না হয়, তাহলে সেটি নিজেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ‘সংকট’, ‘ভয়াবহ অবস্থা’, ‘দাম দ্বিগুণ’—এই শব্দগুলো মানুষকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনাকাটায় প্ররোচিত করে।”

এর ফলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডিং ও ভোক্তা আচরণ

গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত বিজ্ঞাপন ভোক্তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা ও আকর্ষণ তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়—

  • কম দামের বিকল্প পণ্য থাকা সত্ত্বেও

  • মানুষ বেশি বিজ্ঞাপিত ও পরিচিত ব্র্যান্ডই কিনছে

এর ফলে উচ্চ বিজ্ঞাপন ব্যয় করা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। এই ব্র্যান্ডনির্ভর ভোক্তা সংস্কৃতি সামগ্রিকভাবে বাজারমূল্যকে ঊর্ধ্বমুখী করে তোলে।

ভোক্তা আচরণ বিশেষজ্ঞের মত-

ভোক্তা মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষক ড. মাহবুব আলম বলেন,

“বিজ্ঞাপন ভোক্তার মনে ‘মূল্য নয়, ব্র্যান্ডই মান’—এই ধারণা তৈরি করে। এতে বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।”


গণমাধ্যমের সামাজিক দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা

গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হলো জনস্বার্থ রক্ষা, সত্য তুলে ধরা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক চাপের কারণে অনেক সময়—

                                   

  • বড় বিজ্ঞাপনদাতার বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক রিপোর্ট কমে যায়

  • বাজার সিন্ডিকেট ও কর্পোরেট কারসাজি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুর্বল হয়

  • দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির গভীর কারণ আলোচনার বাইরে থেকে যায়

এতে বাজার ব্যবস্থায় জবাবদিহির অভাব তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে।

সিনিয়র সাংবাদিকের অভিমত-

সিনিয়র সাংবাদিক কামাল উদ্দিন বলেন,

“যখন কোনো বড় বিজ্ঞাপনদাতা কোনো পণ্যের দাম বাড়ায়, তখন অনেক গণমাধ্যম সেটি নিয়ে জোরালো অনুসন্ধানে যেতে দ্বিধায় পড়ে। এটি গণমাধ্যমের জন্য একটি নৈতিক সংকট।”


দায় নয়, দায়িত্বের প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণমাধ্যমকে এককভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা যাবে না। তবে এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, গণমাধ্যমের অতিমাত্রায় সংখ্যা, বিজ্ঞাপননির্ভর অর্থনীতি, সংবাদ পরিবেশনের ধরন এবং কর্পোরেট প্রভাব—সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তাই শুধু প্রশাসনিক নজরদারি বা বাজার অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন—

  • দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা

  • বিজ্ঞাপন নীতিমালার বাস্তবায়ন

  • গণমাধ্যমের বাণিজ্যিক চাপ কমানোর কাঠামোগত উদ্যোগ

  • ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি

নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যম ও ভোক্তা—এই তিন পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে।

FAQ: দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও গণমাধ্যম

👉 গণমাধ্যম কি সরাসরি দ্রব্যমূল্য বাড়ায়?

না, গণমাধ্যম সরাসরি দাম বাড়ায় না। তবে বিজ্ঞাপননির্ভর কাঠামোর কারণে পরোক্ষভাবে পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে।

👉 বিজ্ঞাপন ব্যয় কীভাবে ভোক্তার ওপর পড়ে?

বিপুল বিজ্ঞাপন ব্যয় কোম্পানিগুলো পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে, ফলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে বেশি মূল্য দিতে হয়।

👉অতিরিক্ত গণমাধ্যম কেন সমস্যা তৈরি করে?

গণমাধ্যম বেশি হলে বিজ্ঞাপন প্রতিযোগিতা বাড়ে, কর্পোরেট আধিপত্য শক্তিশালী হয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায়।

👉 সংবাদ শিরোনাম কি বাজারে প্রভাব ফেলে?

হ্যাঁ, আতঙ্কসৃষ্টিকারী শিরোনাম ভোক্তাদের অতিরিক্ত কেনাকাটায় প্ররোচিত করে, যা কৃত্রিম চাহিদা ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়।

👉 এই সমস্যা কমাতে কী করা যেতে পারে?

দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, বিজ্ঞাপন নীতিমালার সংস্কার এবং ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই প্রভাব কমানো সম্ভব।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url