আমেরিকার জনপ্রিয় ঈগল দম্পতির ঘরে নতুন অতিথির আগমন
তিনটি নতুন ডিম পেড়েছে বল্ড ঈগল ‘জ্যাকি’, আর ভালোবাসা ও দায়িত্বে মন জিতছেন ‘শ্যাডো’
আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় বল্ড ঈগল দম্পতি সম্প্রতি তাদের জীবনে এক আনন্দঘন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নারডিনো পর্বতমালায় অবস্থিত বিগ বেয়ার ভ্যালিতে বাস করা এই ঈগল জুটি—জ্যাকি ও শ্যাডো—সম্প্রতি তিনটি নতুন ডিমের জন্ম দিয়েছে।
![]() |
| বিগ বেয়ার ভ্যালি ও বিগ বেয়ার ঈগল নেস্ট ক্যামের সৌজন্যে |
এখন সেখানে চলছে বাসা বাঁধার মৌসুম (Nesting Season)। আর এই সময়ে স্ত্রী ঈগল জ্যাকি ও তার সঙ্গী শ্যাডোর পারস্পরিক যত্ন, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা মুগ্ধ করছে হাজারো মানুষকে।
ঈগল ক্যামেরায় ধরা পড়ছে প্রতিদিনের গল্প
এই ঈগল দম্পতির দৈনন্দিন জীবন ধরা পড়ছে বিশেষ একটি “ঈগল ক্যাম”-এ, যা পরিচালনা করছে পরিবেশবাদী সংগঠন Friends of Big Bear Valley। তাদের ফেসবুক পেজ ও Big Bear Eagle Nest Cam–এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লক্ষাধিক মানুষ নিয়মিত দেখছেন এই ঈগল পরিবারের গল্প।
![]() |
২৫ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে জ্যাকি একে একে তিনটি “সুন্দর ও নিখুঁত” ডিম পাড়ে। এই খবরে যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত ছিল, সে হলো তার সঙ্গী শ্যাডো।
প্রথমে বুঝতেই পারেননি শ্যাডো!
Friends of Big Bear Valley-এর নির্বাহী পরিচালক স্যান্ডি স্টিয়ার্স দ্য ইপোক টাইমসকে জানান, তৃতীয় ডিম পাড়ার পরদিন সকালে বাসায় ফিরে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেননি শ্যাডো।
তিনি বলেন,
“সে স্বাভাবিকভাবেই আচরণ করছিল—একটা ডাল নিয়ে এল, জ্যাকির খোঁজখবর নিল। তারপর হঠাৎ জ্যাকি উঠে দাঁড়াল, আর শ্যাডো নিচে তাকিয়ে যেন দুইবার দেখে নিল—‘আমি কি সত্যিই যা দেখলাম, তা দেখেছি?’”
ডিম দেখার পরই বদলে গেল শ্যাডোর আচরণ
যখন শ্যাডো বুঝতে পারল যে জ্যাকি এখন ডিমে তা দিচ্ছে, তখন তার যত্নশীল সত্তা যেন পুরোপুরি জেগে উঠল।
স্যান্ডি স্টিয়ার্স বলেন,
“এরপর থেকে সে জ্যাকিকে একদম আলাদাভাবে দেখছে। সে তার কথা শোনে, তার দিকে মনোযোগ দেয়। জ্যাকির কোনো অস্বস্তি হলে সে সেটা বুঝতে পারে এবং বারবার খোঁজ নেয়।”
ডিমে তা দেওয়ার দায়িত্ব তারা দু’জন ভাগাভাগি করে নেয়। যখন মায়ের পালা থাকে, তখন বাবা শ্যাডো কাছের গাছে বসে পাহারা দেয়।
“কোনো কাক বা অন্য পাখি যদি বাসার কাছাকাছি আসে, শ্যাডো সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে তাড়িয়ে দেয়,” —বলেছেন স্টিয়ার্স।
‘ডাল কৌশল’—শ্যাডোর বিশেষ ট্রিক
যখন জ্যাকি একটু বিরতি নিতে চায়, সে ডাক দিয়ে শ্যাডোকে জানায়। মুহূর্তের মধ্যেই শ্যাডো এসে ডিমে তা দেওয়া শুরু করে। এমনকি জ্যাকি ডাক না দিলেও শ্যাডো নিজে থেকেই দায়িত্ব নিতে চলে আসে।
স্যান্ডি স্টিয়ার্স মজার এক তথ্য জানান,
“শ্যাডো জানে কীভাবে জ্যাকিকে উঠাতে হয়। সে একটা বড় ডাল নিয়ে এসে জোরে জোরে বাসায় ফেলতে থাকে। এতে জ্যাকি সরে যায়, আর শ্যাডো ডিমের দায়িত্ব নেয়—এটা তার নিজের তৈরি এক বিশেষ কৌশল।”
ঝড়ের সময় একাই ৬২ ঘণ্টা বসে ছিলেন জ্যাকি
তবে এই নিয়মের ব্যতিক্রমও আছে। ডিম পাড়ার পরপরই বিগ বেয়ার ভ্যালিতে ভয়াবহ ঝড় শুরু হয়। সেই সময় জ্যাকি একটুও নড়েননি।
“ঝড়, রাত বা খারাপ আবহাওয়া হলে জ্যাকি নিজেই জেদ ধরে বসে থাকে। সে শ্যাডোকে দায়িত্ব দিতে চায় না,” বলেন স্টিয়ার্স।
এই ঝড়ে জ্যাকি টানা ৬২ ঘণ্টা বাসা ছাড়েননি—নিজেরই আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন।
সম্পর্কে কে ‘বস’? জ্যাকি!
ডিম পাড়ার পর খুব দ্রুতই তারা একটি সুন্দর পারিবারিক ছন্দে ফিরে আসে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—
“জ্যাকি পুরোপুরি বস। তবে বস হয়েও সে শ্যাডোকে সম্মান করে,” বলেন স্টিয়ার্স।
ঈগলরা সাধারণত আজীবনের জন্য সঙ্গী বেছে নেয়। জ্যাকির আগেও একজন সঙ্গী ছিল, তবে সে ছিল অনেকটাই দুর্বল।
“ও ছিল একটু নরম প্রকৃতির, জ্যাকি তাকে সবসময় শাসন করত,” বলেন স্টিয়ার্স।
“কিন্তু শ্যাডোর ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। সে যদি কোনো বিষয়ে সিরিয়াস হয়, জ্যাকি সেটা গুরুত্ব দেয়।”
ভালোবাসা, ঝগড়া আর মজার তর্ক
অন্যান্য দম্পতির মতো ঈগল দম্পতির মাঝেও কখনো কখনো ঝগড়া হয়—বিশেষ করে ডিমে তা দেওয়ার পালা নিয়ে।
“শ্যাডো ডিমে বসতে খুব ভালোবাসে। জ্যাকি ফিরলে সে জোরে জোরে তর্ক করে, যেন বলছে—‘না, এখনো আমার পালা!’ কখনো কখনো জ্যাকিকে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে হয়,” বলেন স্টিয়ার্স।
এই টানাপোড়েনই তাদের সম্পর্ককে করেছে আরও প্রাণবন্ত ও মজার।
২০১২ সাল থেকে নজরে এই বাসা
স্যান্ডি স্টিয়ার্স ২০১৮ সাল থেকে জ্যাকি ও শ্যাডোকে একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে এই নির্দিষ্ট বাসাটি নজরদারিতে রয়েছে ২০১২ সাল থেকেই।
২০১৫ সালে এখানে ক্যামেরা বসানো হয়।
২০১৬ সালে আসে জ্যাকি,
আর ২০১৮ সালে দৃশ্যে আসে শ্যাডো।
এরপর থেকেই দু’জনের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
ভালোবাসায় ভরা ঈগল জীবন
স্টিয়ার্স বলেন,
“ওরা একে অপরের প্রতি খুবই কোমল ও স্নেহশীল। বাসা বানানো, খাবার আনা, এমনকি ঠোঁট দিয়ে আদুরে খুনসুটিও করে।”
বাসা বাঁধার মৌসুম ছাড়াও তারা প্রায়ই একই গাছে, একই ডালে বসে বিশ্রাম নেয়—একসঙ্গে জড়িয়ে।
কেন মানুষ এতটা মুগ্ধ?
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই অলাভজনক সংস্থার লাইভস্ট্রিমের কারণে এখন অসংখ্য মানুষ জ্যাকি ও শ্যাডোর জীবনের খুব কাছ থেকে সাক্ষী হচ্ছেন।
“মানুষ তাদের জীবনের জানালায় উঁকি দিতে ভালোবাসে। কাছ থেকে এই দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা আর নিষ্ঠা দেখে তারা বিস্মিত হয়,” বলেন স্টিয়ার্স।
এই ঈগল দম্পতির গল্প শুধু প্রকৃতির নয়—এটা দায়িত্ব, ভালোবাসা আর পারস্পরিক সম্মানের এক জীবন্ত উদাহরণ।






