ইরানে বিক্ষোভ বাড়তে থাকায় শাসকগোষ্ঠীর হাতে হাজারো মানুষ নিহত
ইরানে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ ও বাড়তে থাকা মৃত্যুর সংখ্যার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে।
তেহরানের রাতগুলো রক্তাক্ত: ইরানে নজিরবিহীন সহিংসতা ও দমন-পীড়নের অভিযোগ
তেহরান, ইরান | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের রাজধানী তেহরানে রাত নামলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া এক ইরানি নারীর বর্ণনায় উঠে এসেছে—তেহরানের রাজপথ এখন কার্যত যুদ্ধক্ষেত্র। নিরাপত্তা বাহিনী মোটরসাইকেলে করে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে, আর সকাল হলে রাস্তায় পড়ে থাকছে লাশ, চারপাশে ছড়িয়ে থাকছে রক্তের দাগ।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নারী জানান, তিনি বিক্ষোভ শুরুর ঠিক আগে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তেহরানে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে তিনি গত ১২ জানুয়ারি নেদারল্যান্ডসে ফিরে যান। তার ভাষায়, “প্রতিদিন বিকেলের পর রাস্তাগুলো ভরে যায় মানুষের ভিড়ে। তখন পুরো এলাকা যেন ফ্রন্ট লাইনে পরিণত হয়। গুলির শব্দ ঘরের ভেতর পর্যন্ত শোনা যায়।”
আগের সব আন্দোলনকে ছাড়িয়ে গেছে বর্তমান বিক্ষোভ
ওই নারী জানান, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, বর্তমান আন্দোলন তার চেয়েও অনেক বেশি বড় ও সহিংস। উল্লেখ্য, কুর্দি ইরানি তরুণী মাহসা আমিনির গ্রেপ্তার ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোড়ন তোলে।
বর্তমানে তেহরানের পরিবেশকে তিনি বর্ণনা করেন “নীরব কিন্তু ভারী” হিসেবে। মানুষের চোখেমুখে ক্লান্তি ও গভীর বিষণ্নতা স্পষ্ট।
ট্রাম্পের কড়া বার্তা: ‘প্রতিষ্ঠান দখল নাও, খুনিদের নাম সংরক্ষণ করো’
ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্দোলনকারীদের প্রতি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সরাসরি ও শক্তিশালী সমর্থন জানিয়েছেন।
১৩ জানুয়ারি নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, বিক্ষোভকারীদের উচিত “নিজেদের প্রতিষ্ঠান দখলে নেওয়া” এবং “খুনি ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করা”। তিনি বড় হাতের অক্ষরে লেখেন—“HELP IS ON THE WAY” (সহায়তা আসছে)।
একই পোস্টে ট্রাম্প জানান, যতদিন না বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হচ্ছে, ততদিন তিনি কোনো ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করবেন না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের “বড় মূল্য দিতে হবে”।
ইন্টারনেট বন্ধ, স্যাটেলাইট ডিশ অপসারণ: তথ্য প্রবাহ কার্যত স্তব্ধ
ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ছয় দিন ধরে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি এজেন্টরা কিছু এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্যাটেলাইট ডিশ খুলে নিচ্ছে।
ইরানে স্যাটেলাইট টেলিভিশন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অনেক পরিবার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের বাইরে খবর জানার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহার করে। ইন্টারনেট বন্ধ ও স্যাটেলাইট অপসারণের ফলে দেশটির ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ভয়াবহ আশঙ্কা
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ১৩ জানুয়ারি তারা দুই দিনের বহুমাত্রিক যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—নিরাপত্তা ও সরকারি সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী, হাসপাতালের তথ্য এবং চিকিৎসকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, জানুয়ারির শুরুর দিকে মাত্র দুই রাতেই কমপক্ষে ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ড কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সংঘর্ষের ফল নয়; বরং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) ও বাসিজ বাহিনীর নেতৃত্বে একটি সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে তা চালানো হয়। সূত্রগুলো দাবি করেছে, এই অভিযান সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নির্দেশে এবং ইরানের শীর্ষ শাসন কাঠামোর অনুমোদনে পরিচালিত হয়। নিহতদের বড় একটি অংশের বয়স ছিল ৩০ বছরের নিচে।
গ্রেপ্তার ও হতাহতের সরকারি হিসাব
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানায়, ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৬৪৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০৫ জন বিক্ষোভকারী এবং ৯ জন শিশু রয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার ৭২১ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংস্থাটি দাবি করেছে।
❓ FAQ: ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি ও তেহরানের সহিংসতা
❓ তেহরানে কেন এত বড় বিক্ষোভ হচ্ছে?
ইরানে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ থেকেই এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
❓ তেহরানে কী ধরনের সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে?
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নিরাপত্তা বাহিনী মোটরসাইকেলে করে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। রাতে রাস্তায় লাশ পড়ে থাকার এবং সকালে রক্তের দাগ দেখা যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
❓ ইরানের ইন্টারনেট কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে?
সরকার বিক্ষোভ সংক্রান্ত তথ্য প্রচার ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বন্ধ করতে প্রায় পুরো দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রেখেছে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট ডিশও অপসারণ করা হচ্ছে।
❓ ইরানে এখন পর্যন্ত কত মানুষ নিহত হয়েছে?
নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য রয়েছে।
-
ইরান ইন্টারন্যাশনালের দাবি: কমপক্ষে ১২ হাজার নিহত
-
HRANA-এর হিসাব: অন্তত ৬৪৬ নিহতযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
❓ কারা এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে অভিযোগ?
সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) ও বাসিজ বাহিনী সমন্বিতভাবে অভিযান চালিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে।
❓ যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি ইরানি সরকারের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করেছেন এবং দমন-পীড়নের জন্য দায়ীদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
❓ এই বিক্ষোভ কি ২০২২ সালের মাহসা আমিনি আন্দোলনের চেয়েও বড়?
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বর্তমান বিক্ষোভ আগের সব আন্দোলনের তুলনায় বেশি ব্যাপক, সংগঠিত এবং সহিংস।
❓ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেন উদ্বিগ্ন?
বৃহৎ পরিসরে প্রাণহানি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, তথ্য গোপন এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
❓ ইরানের সাধারণ মানুষের বর্তমান অবস্থা কেমন?
তেহরানের পরিবেশকে প্রত্যক্ষদর্শীরা “নীরব, ভারী ও আতঙ্কপূর্ণ” বলে বর্ণনা করেছেন। মানুষ ক্লান্ত, ভীত এবং গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
❓ এই পরিস্থিতি আরও কতদিন চলতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হতে পারে। তবে ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক চাপের ওপর।



