স্মার্টফোনহীন মানুষের জীবন: ডিজিটাল বাংলাদেশের অদেখা বাস্তবতা

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে বাস ধরতে এখন লাগে মোবাইল অ্যাপ, বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় অনলাইনে, ব্যাংকিং চলে বিকাশ-নগদের মাধ্যমে, এমনকি সরকারি সেবাও এখন অনেকাংশে ডিজিটাল। রাষ্ট্রের প্রচারণায় বাংলাদেশ আজ “ডিজিটাল” থেকে “স্মার্ট বাংলাদেশ”-এর পথে।

কিন্তু এই ডিজিটাল বাস্তবতার মাঝেই এখনো এমন মানুষ আছেন—যাদের হাতে কোনো স্মার্টফোন নেই। তারা না ফেসবুকে আছেন, না মোবাইল অ্যাপে। তবুও তারা এই দেশেই বাস করেন, কাজ করেন, কর দেন, পরিবার চালান।

এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে স্মার্টফোনহীন সেই মানুষদের জীবনযাপন, সংগ্রাম ও অদেখা বাস্তবতা।


“আমার ফোন লাগে না ভাই”—এক বৃদ্ধ রিকশাচালকের গল্প

ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় কথা হয় ৬৭ বছর বয়সী রিকশাচালক আব্দুল করিমের সঙ্গে (নাম পরিবর্তিত)।
হাতে কোনো ফোন নেই। জিজ্ঞেস করতেই তিনি হেসে বললেন,

“এই বয়সে ফোন শিখে কী করব? চোখে কম দেখে, বোতাম টিপতে গেলে ভুল হয়।”

করিমের কোনো স্মার্টফোন নেই, এমনকি সাধারণ বাটন ফোনও নয়। যাত্রী পাওয়ার জন্য তাকে নির্ভর করতে হয় রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বা পরিচিত মহাজনের ডাকে।
বিকাশ বা নগদ নেই, ফলে যাত্রী যদি ডিজিটাল পেমেন্ট করতে চায়, তাকে অন্য রিকশাচালকের সাহায্য নিতে হয়।

স্মার্টফোনহীন মানুষের জীবন



আর্থিক লেনদেন: অন্যের ওপর নির্ভরশীল জীবন

স্মার্টফোন না থাকার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিক লেনদেনে

  • নিজের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট নেই

  • বেতন বা মজুরি নিতে হয় নগদে

  • টাকা পাঠাতে বা নিতে হলে অন্যের ফোন ব্যবহার করতে হয়

মিরপুরের গৃহকর্মী রহিমা বেগম বলেন,

“মালিক বেতন বিকাশে দিতে চায়। তখন পাশের বাড়ির ছেলের ফোনে টাকা নিতে হয়। কখনো কখনো টাকা ঠিকমতো দেয় কি না, বুঝতে পারি না।”

এই নির্ভরশীলতা অনেক সময় প্রতারণার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়—যা তারা বুঝতেও পারেন না।

স্মার্টফোনহীন মানুষের জীবন:

সরকারি সেবার বাইরে পড়ে যাওয়া মানুষ

বর্তমানে জন্মনিবন্ধন সংশোধন, ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশন, ভূমি সেবা, এমনকি অনেক স্কুলের ভর্তি প্রক্রিয়াও অনলাইননির্ভর।
স্মার্টফোনহীন মানুষদের জন্য এসব সেবা হয়ে উঠেছে জটিল।

একজন দিনমজুর জানান,

“অনলাইনে ফরম পূরণ করতে বলে। আমি তো বুঝিই না। দোকানে গিয়ে টাকা দিয়ে করাতে হয়।”

এভাবে তারা পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত খরচ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

স্মার্টফোনহীন মানুষের জীবন

নারী ও স্মার্টফোন: দ্বিগুণ বঞ্চনা

গ্রাম ও নিম্নআয়ের শহুরে এলাকায় অনেক নারীর হাতে স্মার্টফোন নেই—বা থাকলেও ব্যবহার করার অনুমতি নেই।
কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—

  • পরিবারের আপত্তি

  • প্রযুক্তিভীতি

  • শিক্ষার অভাব

  • সামাজিক নিয়ন্ত্রণ

এক গৃহবধূ বলেন,

“স্বামী বলে ফোন থাকলে নষ্ট হয়ে যাব। তাই নেই।”

ফলে তথ্য, স্বাস্থ্যসেবা বা জরুরি যোগাযোগ—সবকিছুতেই তারা পিছিয়ে পড়ছেন।


সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও তথ্য-বঞ্চনা

স্মার্টফোনহীন মানুষরা শুধু প্রযুক্তি থেকে নয়, ধীরে ধীরে সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।

  • জরুরি খবর দেরিতে পান

  • দূরের আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ কম

  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সতর্কবার্তা সময়মতো পান না

এক বৃদ্ধ বলেন,

“বন্যা আসছে—এই খবর আমি পরে শুনি। তখন তো সব শেষ।”


পরিসংখ্যানের আড়ালের বাস্তবতা

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়—

  • শহরে স্মার্টফোন ব্যবহার বেশি হলেও

  • বয়স্ক, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এখনো স্মার্টফোনের বাইরে

বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে যে মানবিক গল্পগুলো আছে, সেগুলো খুব কমই আলোচনায় আসে।


স্মার্টফোনহীন মানুষের জীবন


বিশেষজ্ঞদের মতামত

একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন,

“ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু অ্যাপ বানানো নয়। মানুষকে সেই প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম করে তোলা জরুরি।”

একজন আইসিটি বিশ্লেষকের মতে,

“যদি বিকল্প অফলাইন সেবা না রাখা হয়, তাহলে ডিজিটালাইজেশন নিজেই বৈষম্য তৈরি করবে।”


সমাধান কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধান—

  1. সরকারি সেবায় ডিজিটাল + অফলাইন দুই ব্যবস্থা রাখা

  2. বয়স্কদের জন্য সহজ প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ

  3. ইউনিয়ন/ওয়ার্ড পর্যায়ে ডিজিটাল সহায়তা কেন্দ্র

  4. নারীদের জন্য নিরাপদ ও সচেতনতা-ভিত্তিক উদ্যোগ


শেষ কথা

ডিজিটাল বাংলাদেশের গল্পে স্মার্টফোন একটি প্রধান চরিত্র।
কিন্তু সেই গল্পে এখনো জায়গা হয়নি তাদের—
যাদের হাতে কোনো স্মার্টফোন নেই,
কিন্তু যাদের শ্রমে, ঘামে ও জীবনে এই দেশ দাঁড়িয়ে আছে।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে,
সবার আগে দরকার—
সব মানুষকে সঙ্গে নেওয়ার মানসিকতা।






Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url