শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব: পাঠদানের সময় কেড়ে নিচ্ছে প্রশাসনিক কাজ
বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কেন নিম্ন? মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শিক্ষক নয়, সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার চিত্র।
বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমাজে নেতিবাচক আলোচনা চলমান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতার দায় সরাসরি শিক্ষকদের ওপর চাপানো হলেও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা। বাস্তবে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতি, অব্যবস্থাপনা ও দ্বিমুখী শিক্ষা কাঠামো।
🔶 শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব: পাঠদানের সময় কেড়ে নিচ্ছে প্রশাসনিক কাজ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বর্তমানে শুধু পাঠদানে সীমাবদ্ধ নেই। পাঠদানের বাইরেও তাদের করতে হয়—
অপ্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ
উপবৃত্তি তথ্য সংগ্রহ ও অনলাইন এন্ট্রিশিশু জরিপ ও স্বাস্থ্য জরিপ
ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নির্বাচন দায়িত্ব
কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো
বিদ্যালয় পরিষ্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন
এগুলো “non-teaching workload in primary education” হিসেবে আন্তর্জাতিক গবেষণায় চিহ্নিত সমস্যা।
🔶 শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৯৭–৯৮% শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অধিকাংশ অভিভাবক—
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন না
উপবৃত্তির জন্য স্কুলে পাঠান
বিনা খরচে পড়াশোনা—এই সুবিধাকেই গুরুত্ব দেন
ফলে শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থী ও পরিবার—দু’পক্ষেরই দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহ তৈরি হয় না।
🔶 কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি স্কুলের আগ্রাসন
প্রায় প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই গড়ে উঠেছে—
কিন্ডারগার্টেন স্কুল
বেসরকারি ইংলিশ ভার্সন স্কুল
ব্র্যাক ও অন্যান্য এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়
⚠️ আশ্চর্যের বিষয়—এই প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারি অনুমোদন ও সরকারি বই সুবিধা পাচ্ছে।
👉 ফলাফল:
সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী কমছে
মেধাবী শিক্ষার্থী সরে যাচ্ছে
সরকারি বিদ্যালয় “দরিদ্রদের স্কুল” হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে
🔶 নীতিনির্ধারকদের অভিজ্ঞতা সংকট
সচেতন নাগরিক সমাজ বলছে—
“যারা একদিনও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেননি, তারাই প্রাথমিক শিক্ষার নীতি নির্ধারণ করছেন।”
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত অনেক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার শিক্ষকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই।
📌 আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে শিক্ষা নীতিতে শিক্ষক ও গবেষকের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক, সেখানে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম।
🔶 অভিজাত শ্রেণি সরকারি স্কুলে সন্তান না পড়ানোই বড় সংকট
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—
- মন্ত্রী
- সচিব
- শিক্ষা কর্মকর্তা
- রাজনীতিবিদ
- উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি
👉 কেউই তাদের সন্তানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ান না।
এতে তৈরি হয়েছে একটি দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা, যা শিক্ষার মান ধ্বংসের অন্যতম কারণ।
🔶 সমাধান কী বলছে সচেতন নাগরিক সমাজ?
তাদের মতে—
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা সীমিত/বন্ধ করতে হবে
সব শ্রেণির শিশু সরকারি বিদ্যালয়ে ফিরলে মান বাড়বে
নাগরিকদের শিক্ষা ব্যয় কমবে
দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি ও বৈষম্য হ্রাস পাবে
🔶 দায় এড়ানোর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার নিম্নমানের জন্য শিক্ষক নয়, দায়ী—
✔ অবাস্তব শিক্ষা নীতি
✔ দুর্বল ব্যবস্থাপনা
✔ অভিজ্ঞতাহীন নীতিনির্ধারক
✔ দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা👉 শিক্ষকদের দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার ও সাহসী সিদ্ধান্ত।
🔶 FAQ :
👉 সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কেন কম?
মূলত নীতি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ এবং দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে।
👉 শিক্ষকরাই কি শিক্ষার মান কমার জন্য দায়ী?
না। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে শিক্ষকরা নীতিগত ব্যর্থতার শিকার।
👉 কিন্ডারগার্টেন স্কুল কি সরকারি শিক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?
হ্যাঁ। এতে মেধাবী শিক্ষার্থী সরকারি বিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছে।
👉 নীতিনির্ধারকদের অভিজ্ঞতার অভাব কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ বাস্তব শ্রেণিকক্ষ না জানলে কার্যকর শিক্ষা নীতি তৈরি সম্ভব নয়।
👉 সমাধান কী হতে পারে?
একীভূত সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা, নীতিগত সংস্কার ও অভিজাত শ্রেণির অংশগ্রহণ।




