শিক্ষা নীতির ঘনঘন পরিবর্তন: উন্নয়ন না কি প্রজন্মের জন্য ভোগান্তি

 স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষা নীতি এখনও দৃশ্যমান নয়। https://www.effectivegatecpm.com/vdi0rfswd?key=e3693583f4ae4a61225dfb35833d66ff

শিক্ষা নীতির ঘনঘন পরিবর্তন
রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিমালার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পরিবর্তনের লক্ষ্য হওয়া উচিত সময়োপযোগী উন্নয়ন, জনকল্যাণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপযোগী করে গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সব পরিবর্তনই যে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে, তা নয়। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থা এমন একটি খাত, যেখানে বারবার ও অপরিকল্পিত পরিবর্তন দেশের জনগণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষা খাতে অসংখ্য সংস্কার ও পরিবর্তন দেখা গেছে, কিন্তু একটি স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষা নীতি এখনও দৃশ্যমান নয়।

শিক্ষা নীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব। এক সরকার আসে, নতুন নীতি প্রণয়ন করে; পরবর্তী সরকার এসে আগের নীতিকে আংশিক বা সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন কাঠামো দাঁড় করায়। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজ।

শিক্ষা এমন একটি খাত, যার ফলাফল তাৎক্ষণিক নয়; এর প্রভাব পড়ে দীর্ঘ ১০–২০ বছর পর। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষা নীতির মূল্যায়ন করা হয় স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক অর্জনের আলোকে —

  • শিক্ষার্থীরা মাঝপথে নিয়ম বদলের শিকার হয়

  • একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন সময়ে পড়াশোনা করায় বৈষম্য তৈরি হয়

  • শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা কমে যায়

শিক্ষা নীতির ঘনঘন পরিবর্তন

শিক্ষা যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সেখানে হঠাৎ পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে একটি পুরো প্রজন্মকে।


গ্রেড-পয়েন্ট পদ্ধতি: সমস্যার শুরু

২০০১ সালে বাংলাদেশে পুরাতন ডিভিশন পদ্ধতি বাতিল করে গ্রেড-পয়েন্ট (GPA) পদ্ধতি চালু করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মেধা ও দক্ষতাকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে মূল্যায়ন করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—

ঐচ্ছিক বিষয়ের নম্বর নিয়ে বিভ্রান্তি

  • ২০০১–২০০৩: ঐচ্ছিক বিষয়ের নম্বর মোট নম্বরের সঙ্গে যোগ হয়নি

  • ২০০৪ থেকে: ঐচ্ছিক বিষয়ের নম্বর যোগ হওয়া শুরু হয়

এর ফলে একই মেধা থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দেয়। যা চাকরি ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যায্য প্রতিযোগিতা তৈরি করে।


গ্রেড সংখ্যা বৃদ্ধি ও GPA সংস্কৃতি

পরবর্তীতে গ্রেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করায় GPA 5.00 পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে—

  • প্রকৃত মেধাবীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে

  • GPA একটি আনুষ্ঠানিক সংখ্যায় পরিণত হয়

  • কোচিং ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়

আজ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাও GPA–এর ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না, অথচ বিকল্প কোনো কার্যকর মূল্যায়ন পদ্ধতিও গড়ে ওঠেনি।


চার বছর মেয়াদি অনার্স: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

একসময় তিন বছর মেয়াদি অনার্স কোর্সকে চার বছরে উন্নীত করা হয়। শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল—

“চার বছর মেয়াদি অনার্স সম্পন্ন করলে মাস্টার্স করার প্রয়োজন হবে না।”

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল—

  • সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে মাস্টার্স এখনো অঘোষিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ

  • উচ্চতর গ্রেড ও পদোন্নতিতে মাস্টার্সধারীরা এগিয়ে

  • চার বছর অনার্সধারীরা চাকরির বাজারে বিশেষ সুবিধা পান না

ফলে শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও শ্রম—সবই দ্বিগুণ ব্যয় হচ্ছে।


সিলেবাস পরিবর্তন ও শিক্ষার মান

প্রতিনিয়ত সিলেবাস পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞান অর্জনের বদলে শুধু পরীক্ষায় পাশের কৌশল শিখছে। শিক্ষকরা নতুন সিলেবাস বুঝতে না বুঝতেই আবার পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব—

প্রতিনিয়ত পাঠ্যক্রম ও সিলেবাস পরিবর্তনের ফলে—

  • শিক্ষকরা পাঠদান পদ্ধতিতে স্থিতি পান না

  • শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞান অর্জনের বদলে পরীক্ষামুখী হয়ে পড়ে

  • গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষার বৈষম্য আরও প্রকট হয়

  • শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য

  • শিক্ষার মানের অবনমন

  • বাস্তব দক্ষতার অভাব

বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

চাকরির বাজারে একক স্কেলের বৈষম্য

শিক্ষা নীতির ঘনঘন পরিবর্তন

সরকারি ও বেসরকারি চাকরির বাজারে শিক্ষা ব্যবস্থার এই পরিবর্তনগুলোর আলাদা কোনো মূল্যায়ন নেই। সবাইকে একই স্কেলে পরিমাপ করা হয়—

  • একই পদে আবেদন করে ভিন্ন সিস্টেমে পড়াশোনা করা প্রার্থীরা

  • ভিন্ন সময়ের ভিন্ন নিয়মে পাশ করা শিক্ষার্থীরা

  • GPA-নির্ভর শর্টলিস্টিংয়ের কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাদ পড়া

  • ভিন্ন সময়ের ভিন্ন নিয়মে পাশ করা প্রার্থীদের একই স্কেলে বিচার করা হয়

  • শিক্ষা নীতির পরিবর্তনের কোনো সমন্বিত মূল্যায়ন নেই

  • যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে পিছিয়ে পড়ে

ফলে একটি বড় অংশের তরুণ সমাজ নিজেকে বঞ্চিত ও প্রতারিত মনে করে, যা হতাশা ও কর্মবিমুখতার জন্ম দেয়।

শিক্ষা নীতির পরিবর্তনের সামগ্রিক প্রভাব

এই অব্যবস্থাপনার প্রভাব শুধু শিক্ষার্থী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়—

  • দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না

  • বেকারত্ব ও হতাশা বাড়ছে

  • বিদেশমুখী তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে

  • রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে

  • রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়


করণীয় কী?

  • দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
  • রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা নীতি

  • শিক্ষা সংস্কারে অন্তত ১০–১৫ বছরের স্থায়িত্ব

  • চাকরিতে GPA–এর পাশাপাশি দক্ষতা মূল্যায়ন

  • চাকরির ক্ষেত্রে ব্যাচ ও মূল্যায়ন পদ্ধতির বাস্তবতা বিবেচনা

  •  সিলেবাস পরিবর্তনে অন্তত ১০ বছরের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা

পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু অপরিকল্পিত ও ঘনঘন পরিবর্তন উন্নয়ন নয়—বরং তা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে এবং  শিক্ষা ব্যবস্থায় অপরিকল্পিত পরিবর্তন একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার খেসারত দিতে হয় পুরো জাতিকে। তাই সময় এসেছে শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা বন্ধ করে, শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা বন্ধ করে, শিক্ষা নীতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানিয়ে, একটি স্থিতিশীল, বাস্তবমুখী ও মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করার।

FAQ:

👉 বাংলাদেশের শিক্ষা নীতিতে বারবার পরিবর্তনের কারণ কী?

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নীতিগত অগ্রাধিকারের পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবই এর প্রধান কারণ।

👉 গ্রেড-পয়েন্ট পদ্ধতি কি শিক্ষার মান উন্নত করেছে?

আংশিকভাবে উন্নতি হলেও অপরিকল্পিত প্রয়োগের কারণে এটি নতুন বৈষম্য তৈরি করেছে।

👉 চার বছর মেয়াদি অনার্স করেও কেন মাস্টার্স করতে হয়?

চাকরি ও উচ্চশিক্ষার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে নীতিগত প্রতিশ্রুতির সমন্বয় না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

👉 ঘনঘন সিলেবাস পরিবর্তনের প্রভাব কী?

শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং শিক্ষার মান কমছে।

👉 শিক্ষা নীতির এই পরিবর্তন চাকরির বাজারে কী প্রভাব ফেলছে?

একই স্কেলে ভিন্ন বাস্তবতায় পড়াশোনা করা প্রার্থীদের মূল্যায়ন করায় বৈষম্য ও বঞ্চনা তৈরি হচ্ছে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url