তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নীতি | ধূমপান বন্ধে সরকারের বাস্তবতা

তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নীতি: সচেতনতার আড়ালে বাস্তবতার সংকট https://www.effectivegatecpm.com/vdi0rfswd?key=e3693583f4ae4a61225dfb35833d66ff

তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নীতি

তামাক ও ধূমপান যে মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর—এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী ঐকমত্য রয়েছে। ক্যান্সার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোকসহ অসংখ্য প্রাণঘাতী রোগের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। বাংলাদেশ সরকারও ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে বিভিন্ন দিবস পালন, সভা-সেমিনার আয়োজন, সতর্কতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার এবং সিগারেটের প্যাকেটে বড় করে লেখা—“ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর”। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ধূমপান ও তামাক ব্যবহার কমার পরিবর্তে দিন দিন আরও বৈচিত্র্যময় ও বিস্তৃত হচ্ছে। 

তামাক ও ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হলেও বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব রয়েছে। কেন কমছে না ধূমপান ও মাদক ব্যবহার—বিশ্লেষণ।

তামাক ও ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব

তামাকজাত পণ্যে থাকা নিকোটিন, টার ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। নিয়মিত ধূমপানের ফলে ফুসফুস ক্যান্সার, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD), হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। শুধু ধূমপায়ী নয়, প্যাসিভ স্মোকিংয়ের মাধ্যমে শিশু ও নারীরাও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে নীরব মহামারি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নীতি

সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি: কাগজে-কলমে শক্ত

তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নীতি

বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, ধূমপানমুক্ত এলাকা ঘোষণা, বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা ও কর বৃদ্ধি—সবই আছে। প্রতিবছর বাজেটে সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানো হয়। উদ্দেশ্য—মূল্য বৃদ্ধি করে ব্যবহার কমানো। পাশাপাশি বিভিন্ন দিবসে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হয়।

বাস্তবতা কেন ভিন্ন?

তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নীতি

উৎপাদন ও অনুমোদনের প্রশ্ন

একদিকে সরকার ধূমপান নিরুৎসাহিত করার কথা বলছে, অন্যদিকে তামাকজাত পণ্য উৎপাদনের জন্য নতুন নতুন কারখানার অনুমোদন দিচ্ছে। বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিগুলো কৃষকদের অগ্রিম অর্থ দিয়ে মাঠের পর মাঠ তামাক চাষ করাচ্ছে। এই দ্বৈত নীতি সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।

রাজস্ব নির্ভরতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ

তামাক খাত থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব পায়। ফলে অনেকের মতে, সরকার তামাক পুরোপুরি বন্ধে আগ্রহী নয়। কর বাড়ানো হলেও এতে তামাকের ব্যবহার কমে না, বরং নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

আইন প্রয়োগের দুর্বলতা

তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নীতি

ধূমপানমুক্ত এলাকা ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই দুর্বল। প্রকাশ্যে ধূমপান করলেও শাস্তির নজির কম। ফলে আইন থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না।

নতুন পণ্য ও বিপণন কৌশল

সিগারেটের পাশাপাশি গুল, জর্দা, ভ্যাপ ও ই-সিগারেটের মতো নতুন পণ্য বাজার দখল করছে। তরুণদের লক্ষ্য করে আকর্ষণীয় মোড়ক ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে।

সচেতন নাগরিক সমাজের ক্ষোভ

তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নীতি

সচেতন নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে—সরকার সত্যিই যদি মাদক ও তামাক বন্ধ করতে চাইত, তাহলে উৎপাদনের অনুমতি দিত না। প্যাকেটে সতর্কবার্তা লিখে আবার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ চালু রাখা জনগণের সঙ্গে এক ধরনের তামাশা। অনেকেই সরকারের মনোভাবকে ‘কানামাছি খেলা’র সঙ্গে তুলনা করেন।

কর-ভ্যাট বৃদ্ধি কি কার্যকর সমাধান?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর বাড়িয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আসক্ত ধূমপায়ীরা বাড়তি দাম দিয়েও পণ্য কিনতে থাকে। এতে অবৈধ বাজার গড়ে ওঠার আশঙ্কাও বাড়ে। ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই নীতি এককভাবে কার্যকর নয়।

করণীয় কী?

তামাক চাষ ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ

তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করে কৃষকদের জন্য বিকল্প ফসল ও পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কঠোরতা

নতুন কারখানার অনুমোদন বন্ধ, বিদ্যমান লাইসেন্স পুনর্মূল্যায়ন এবং সব ধরনের তামাক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করতে হবে।

আইন প্রয়োগ জোরদার

ধূমপানমুক্ত এলাকা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান শাস্তি ও জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে।

চিকিৎসা ও পুনর্বাসন

তামাক আসক্তদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা বাড়াতে হবে।

তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে সত্যিকারের সাফল্য পেতে হলে দ্বৈত নীতি পরিহার করে জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উৎপাদন, বাজারজাত ও চাষ—সব পর্যায়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেই কেবল একটি মাদকমুক্ত, সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গঠন সম্ভব হবে।

❓ Frequently Asked Questions (FAQ):

👉 তামাক ও ধূমপান কেন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?

তামাকজাত পণ্যে থাকা নিকোটিন ও বিষাক্ত রাসায়নিক ক্যান্সার, হৃদ্‌রোগ, ফুসফুসের রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত ধূমপান মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি করে।

👉 বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার কেন কমছে না?

আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ দুর্বল। পাশাপাশি তামাক উৎপাদন ও চাষে সরকারি অনুমোদন থাকায় ব্যবহার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

👉 তামাক নিয়ন্ত্রণে কর ও ভ্যাট বৃদ্ধি কতটা কার্যকর?

শুধু কর বাড়ালে আসক্ত ধূমপায়ীরা ব্যবহার বন্ধ করে না। বরং এতে অবৈধ বাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি থাকে।

👉 তামাক চাষ বন্ধ করলে কৃষকরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

তামাক চাষ ধাপে ধাপে বন্ধ করে বিকল্প ফসল ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করলে কৃষকদের ক্ষতি কমিয়ে টেকসই কৃষি নিশ্চিত করা সম্ভব।

👉 তামাক ও মাদক নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ কী?

উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ জোরদার এবং আসক্তদের জন্য চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url