পোস্টাল ব্যালটের নতুন উদ্যোগ: সুযোগের বদলে বৈষম্য
পোস্টাল ব্যালট চালু হলেও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত লক্ষ লক্ষ কর্মজীবী: নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে প্রশ্ন
পোস্টাল ব্যালট নিবন্ধন ও ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে হলে আগ্রহী ভোটারদের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে। এই নিবন্ধনের
ক্ষেত্রে—
-
প্রবাসী বাংলাদেশিরা সুযোগ পাচ্ছেন
-
সরকারি চাকরিজীবীরা সুযোগ পাচ্ছেন, শর্ত সাপেক্ষে
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক।
ইএফটি (EFT- iBAS++) শর্ত: বৈষম্যের মূল কারণ
নির্বাচন কমিশন পোস্টাল ব্যালটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করেছে—
👉 যেসব সরকারি কর্মচারীর বেতন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) বা iBAS++ সিস্টেমের মাধ্যমে প্রদান করা হয়, কেবল তারাই এই সুবিধা পাবেন।
এই শর্তের ফলে—
-
রাষ্ট্র মালিকানাধীন ২২২২
-
স্বায়ত্তশাসিত
-
আধা-স্বায়ত্তশাসিত
-
আধা-সরকারি
-
জরুরি সেবাদানকারী
বহু প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এই সুবিধার বাইরে থেকে গেছেন, কারণ তাদের বেতন এখনো ইএফটি বা iBAS++ কাঠামোর আওতায় নয়।
জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা কেন বঞ্চিত?
দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সেবাদানকারী বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের কর্মীরা দিনরাত নাগরিক সেবায় নিয়োজিত থাকেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারাই আজ ভোটাধিকার প্রশ্নে অবহেলিত।
যেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পোস্টাল ব্যালট থেকে বাদ পড়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
-
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (PDB) ও এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানসমূহ
-
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসমূহ
-
বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান
-
পানি, গ্যাস, বন্দর, পরিবহনসহ বিভিন্ন জরুরি সেবাদানকারী সংস্থা
এইসব প্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ কর্মজীবী কাজ করেন, যাদের বড় একটি অংশ নিজ জেলা থেকে বহু দূরে কর্মরত।
বেসরকারি খাত: সম্পূর্ণ উপেক্ষিত এক বিশাল জনগোষ্ঠী
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।
অথচ বাস্তবতা হলো—
-
গার্মেন্টস, শিল্পকারখানা, এনজিও, কর্পোরেট সেক্টরসহ
-
লক্ষ লক্ষ বেসরকারি কর্মজীবী নিজ জেলা থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে কাজ করেন
-
একদিনের সরকারি ছুটি বা সাধারণ ছুটিতে তাদের পক্ষে নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দেওয়া প্রায় অসম্ভব
এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পোস্টাল ব্যালটের বাইরে রাখায় ভোটাধিকার কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে।
স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও বঞ্চনা কেন?
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব নাগরিকের কাছেই রয়েছে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)।
এই স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে—
-
ভোটারের পরিচয় যাচাই
-
ডাটাবেজ মিলিয়ে ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ
-
ডিজিটাল ট্র্যাকিং
সবই সম্ভব।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—
🔴 শুধু বেতন কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে কেন ভোটাধিকার নির্ধারণ করা হবে?
🔴 কর্মস্থলের দূরত্ব ও বাস্তব পরিস্থিতিকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হলো না?
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
এই পরিস্থিতি নিয়ে সচেতন নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা বলছেন—
-
এটি নির্বাচন কমিশনের অজ্ঞতা, দায়বদ্ধতাহীনতা ও উদাসীনতার প্রতিফলন
-
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি “সবার ভোটাধিকার”—তা এখানে ক্ষুণ্ন হয়েছে
-
পোস্টাল ব্যালটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ আংশিক ও বৈষম্যমূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে
অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচন কমিশন যদি—
-
সব স্মার্ট এনআইডি কার্ডধারী কর্মজীবী
-
নিজ জেলা থেকে দূরে কর্মরত ভোটার
এই মানদণ্ডে পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ দিত, তবে এটি সত্যিকার অর্থেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগান্তকারী উদ্যোগ হতো।
সংস্কার উদ্যোগ, কিন্তু অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ। কিন্তু এই উদ্যোগের বাস্তবায়নে যদি—
-
লক্ষ লক্ষ জরুরি সেবাদানকারী কর্মী
-
স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী
-
বেসরকারি খাতের কর্মজীবী
ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সেই উদ্যোগ গণতন্ত্রের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
এখনো সময় আছে। সচেতন নাগরিক সমাজ আশা করে—
🔹 নির্বাচন কমিশন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে
🔹 পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও ন্যায্য করবে
🔹 এবং সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে
🔶 FAQ :
👉 পোস্টাল ব্যালট কী?
পোস্টাল ব্যালট হলো এমন একটি ভোট পদ্ধতি, যেখানে ভোটার সরাসরি ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে ডাক বা নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোট প্রদান করতে পারেন।
👉 কারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন?
বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং EFT/iBAS++ বেতনভুক্ত সরকারি চাকরিজীবীরা এই সুযোগ পাচ্ছেন।
👉 কেন অনেক সরকারি ও জরুরি সেবাদানকারী কর্মী বাদ পড়েছেন?
কারণ তাদের বেতন EFT বা iBAS++ সিস্টেমের মাধ্যমে প্রদান করা হয় না, যা নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত শর্ত।
👉 বেসরকারি কর্মজীবীরা কেন পোস্টাল ব্যালটের আওতায় নেই?
নির্বাচন কমিশন পোস্টাল ব্যালট নীতিমালায় বেসরকারি খাতের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করেনি।
👉 এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা কেন হচ্ছে?
কারণ স্মার্ট এনআইডি থাকা সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ কর্মজীবী বাস্তব কারণে ভোট দিতে পারছেন না, যা গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
.jpg)
.jpg)

