একটি সরকারি অফিসে একদিন: সেবা পেতে কত ধাপ, কত সময়, কত ভোগান্তি
সকাল নয়টা। রাজধানীর একটি ব্যস্ত সরকারি অফিস।
হাতে ফাইল, চোখে আশা—আজ হয়তো কাজটা শেষ হবে।
কিন্তু দিন শেষে সেই আশাই বদলে যায় ক্লান্তি, হতাশা আর দীর্ঘ অপেক্ষার গল্পে।
একটি সরকারি সেবা পেতে একজন সাধারণ নাগরিককে পেরোতে হয় কতগুলো ধাপ, কত ঘণ্টা অপেক্ষা, কতটা মানসিক চাপ—
সেই বাস্তবতার অনুসন্ধানেই এই বিশেষ প্রতিবেদন।
![]() |
| বাংলাদেশের সরকারি অফিসে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সেবা প্রত্যাশী মানুষ |
🏛️ সকাল ৯টা: লাইনের শুরু
সরকারি অফিসের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা সকাল ৯টায়।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
সকাল সাড়ে ৮টা থেকেই অফিস ভবনের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন সেবাগ্রহীতারা।
কেউ জন্মনিবন্ধন সংশোধনের জন্য, কেউ ভূমি সংক্রান্ত কাগজে স্বাক্ষরের জন্য, কেউবা প্রয়োজনীয় সনদের আশায়।
একজন সেবাগ্রহীতা জানান,
“ভাই, ৯টায় অফিস খুলবে শুনে ৮টায় আসছি। না আসলে সিরিয়ালই পাওয়া যায় না।”
⏳ প্রথম ধাপ: কাগজ যাচাই
অফিসে ঢোকার পরই শুরু হয় প্রথম ধাপ—কাগজ যাচাই।
এই ধাপে:
-
আবেদনপত্র ঠিক আছে কি না
-
সংযুক্ত কাগজ সম্পূর্ণ কি না
-
আগের কোনো ত্রুটি আছে কি না
একটি কাউন্টারে গড়ে সময় লাগে ১০–১৫ মিনিট,
কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ৩০–৪৫ মিনিট।
অনেক ক্ষেত্রেই এখানেই শোনা যায়—
“এই কাগজটা নাই”,
“ওই সাইনটা লাগবে”,
“আরেকটা ফটোকপি আনেন।”
![]() |
| ছবি: কাউন্টার থেকে কাউন্টারে ঘুরে বেড়ানো সেবাগ্রহীতা |
🔁 কাউন্টার থেকে কাউন্টারে ঘোরাঘুরি
প্রথম কাউন্টার শেষ মানেই কাজ শেষ নয়।
একটি সাধারণ সেবা পেতে গড়ে যেতে হয়—
-
কাউন্টার ১: কাগজ যাচাই
-
কাউন্টার ২: ফি জমা
-
কাউন্টার ৩: সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সই
-
কাউন্টার ৪: রেজিস্ট্রেশন/এন্ট্রি
অর্থাৎ, একটি সেবা = ৪ থেকে ৬টি ধাপ।
একজন বয়স্ক সেবাগ্রহীতা বলেন,
“এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠায়।
কোনটা শেষ, কোনটা বাকি—আমরাই বুঝি না।”
🕐 দুপুর ১টা: অপেক্ষার দীর্ঘতা
দুপুর গড়িয়ে যায়।
ঘড়ির কাঁটা ১টা ছুঁলেও অনেকের কাজ অর্ধেকও শেষ হয়নি।
এই সময় অফিসে উপস্থিত সেবাগ্রহীতার সংখ্যা থাকে ৭০–১০০ জন।
অনেকেই বসে আছেন সিঁড়িতে, বারান্দায়, কেউবা দাঁড়িয়ে।
গড়ে একজন নাগরিককে অপেক্ষা করতে হয়—
👉 ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা
![]() |
| ছবি: দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা বৃদ্ধ ও নারী সেবাপ্রার্থী |
💬 ঘুষের ইঙ্গিত: বলা হয় না সরাসরি
এই প্রতিবেদনে কারও বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ নয়,
তবে বাস্তবতার একটি দিক বারবার উঠে এসেছে—ইঙ্গিতমূলক ঘুষ।
কেউ সরাসরি টাকা চান না।
কিন্তু বলা হয়—
-
“আজ চাইলে সহজ হবে”
-
“দালাল ধরলে আজই হয়ে যাবে”
একজন সেবাগ্রহীতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,
“বললো—৫০০ দিলে আজই হবে।
না দিলে আবার আসতে হবে।”
অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ইঙ্গিতমূলক লেনদেনের অঙ্ক দাঁড়ায়
👉 ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত।
👥 দালাল নির্ভরতা
অফিস চত্বরে ঘোরাফেরা করেন কিছু পরিচিত মুখ।
তারা সরাসরি কর্মকর্তা নন,
তবে অনেকেই জানেন—এই লোকদের ধরলে কাজ দ্রুত হয়।
একজন তরুণ সেবাগ্রহীতা বলেন,
“নিজে করলে তিন দিন লাগে।
ওদের ধরলে একদিনেই হয়।”
![]() |
| ছবি: সারাদিন অপেক্ষার পর সরকারি অফিস থেকে হতাশ হয়ে ফেরা মানুষ |
🌆 বিকাল ৪টা: ক্লান্তির চূড়ান্ত পর্যায়
বিকাল ৪টার দিকে অফিস কার্যক্রম প্রায় শেষ।
কিন্তু সব কাজ শেষ হয় না।
অনেকেই হাতে ফাইল নিয়েই ফিরে যান—
👉 “আগামীকাল আসবেন”
👉 “স্যার আজ নেই”
👉 “কাল আবার চেষ্টা করেন”
মুখে হতাশা, চোখে ক্লান্তি।
![]() |
| ছবি: নোটিশ বোর্ডে ঝুলে থাকা জটিল নিয়ম-কানুন |
🔍 সার্বিক চিত্র এক নজরে
| বিষয় | গড় হিসাব |
|---|---|
| অফিসে আসার সময় | সকাল ৮–৯টা |
| ধাপ সংখ্যা | ৪–৬টি |
| কাউন্টার | ৩–৫টি |
| অপেক্ষার সময় | ৪–৬ ঘণ্টা |
| সেবাগ্রহীতা | ৭০–১০০ জন |
| ঘুষের ইঙ্গিত | ৫০০–২০০০ টাকা |
🗣️ বিশেষজ্ঞ মত
সুশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন,
“প্রক্রিয়া জটিল হওয়াতেই নাগরিক দুর্ভোগ বাড়ে।
ডিজিটাল ও একক-জানালা সেবা না হলে এই ভোগান্তি কমবে না।”
একটি সরকারি অফিসে একদিন মানেই—
-
দীর্ঘ লাইন
-
ধাপে ধাপে ঘোরাঘুরি
-
অনিশ্চিত সময়
-
আর নীরব চাপ
প্রশ্ন থেকেই যায়—
সেবা কি নাগরিকের অধিকার,
নাকি সহ্য আর ধৈর্যের পরীক্ষা?
FAQ:
1️⃣ সরকারি অফিসে একটি সেবা পেতে গড়ে কত সময় লাগে?
একটি সাধারণ সেবা পেতে গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। ভিড় বেশি হলে বা কাগজে ত্রুটি থাকলে সময় আরও বাড়তে পারে।
2️⃣ একটি সরকারি অফিসে সেবা পেতে কয়টি ধাপ বা কাউন্টার পার হতে হয়?
গড়ে ৪ থেকে ৬টি ধাপ/কাউন্টার পার হতে হয়—কাগজ যাচাই, ফি জমা, কর্মকর্তার স্বাক্ষর, রেজিস্ট্রেশনসহ একাধিক ধাপ থাকে।
3️⃣ সরকারি অফিসে ঘুষ কি সরাসরি চাওয়া হয়?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরাসরি ঘুষ চাওয়া হয় না। তবে “আজ হলে ভালো”, “দালাল ধরলে দ্রুত হবে”—এমন ইঙ্গিতমূলক কথাবার্তা শোনা যায়।
4️⃣ দালাল ধরলে কি সত্যিই কাজ দ্রুত হয়?
অনেক সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দালালের মাধ্যমে কাজ তুলনামূলক দ্রুত হয়, তবে এতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় এবং এটি অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ।
5️⃣ সরকারি অফিসে ভোগান্তি কমাতে কী করা যেতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে—
-
ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু
-
ডিজিটাল টোকেন ও নির্দিষ্ট সময়সীমা
-
দালালবিরোধী নজরদারি
-
সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা
ভোগান্তি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।




